স্বৈরাচারী শাসনের পতন: গণতন্ত্র, দুর্নীতি ও মানবাধিকারের প্রশ্নে জনগণের জাগরণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত ১৭ বছর (২০০৯-২০২৪) আওয়ামী লীগের শাসনকাল, বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, একটি জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, দুর্নীতির ব্যাপকতা, সামাজিক অবিচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর সমস্যাগুলো জাতিকে একটি সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, যা শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়, এই সমস্যাগুলোর প্রতি জনগণের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের প্রতিফলন। এই সম্পাদকীয়তে আমরা আলোচনা করব কীভাবে একটি সরকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে এবং কেন জনগণের সচেতনতা এই ধরনের শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল জনাদেশ নিয়ে ক্ষমতায় আসে, যা প্রাথমিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন ছিল। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এই নির্বাচনগুলো বিরোধী দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর উপর নিষ্ঠুর দমননীতি, বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার, এবং নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগে কলঙ্কিত হয়েছে। ফ্রিডম হাউসের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা এই সময়কালে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সূচকের উল্লেখযোগ্য অবনতি রেকর্ড করেছে, যা দেশটিকে ‘নির্বাচনী স্বৈরাচার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন করেছে। ২০১৪ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদকে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই ধরনের পদক্ষেপ সরকারকে একটি স্বৈরাচারী কাঠামোতে রূপান্তরিত করে, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জবাবদিহিতার কোনো স্থান ছিল না।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে দুর্নীতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করেনি, বরং সমাজে গভীর বৈষম্য ও অবিচারের জন্ম দিয়েছে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত ছিল, তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করে। ২০২৪ সালে এই কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনই জুলাই অভ্যুত্থানের সূচনা করে।
দুর্নীতির ফলে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়নি, বরং শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মহল এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে এবং জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে প্রায় ৬০০টি গুম এবং অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর মতো নিরাপত্তা বাহিনীগুলো বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নির্মম দমননীতি চালিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সহিংসতায় ১,৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়, যার মধ্যে শিশু এবং নারীও ছিল।
এই নৃশংসতা জনগণের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। জুলাইয়ের আন্দোলন, যা প্রাথমিকভাবে চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়েছিল, দ্রুত সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শেখ হাসিনার ‘রাজাকার’ মন্তব্য, যা আন্দোলনকারী ছাত্রদের অপমান করেছিল, জনগণের ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়। ফলস্বরূপ, ৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন, এবং আওয়ামী লীগের শাসনের অবসান ঘটে।
এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি সরকার যখন জনগণের কণ্ঠরোধ করে, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন নষ্ট করে এবং দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে, তখন জনগণের সচেতনতাই সেই শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, জনগণ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো স্বৈরাচারী শাসন টিকে থাকতে পারে না।
তবে, এই বিজয়ের পরেও বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং মানবাধিকারের পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এই সংস্কার প্রক্রিয়া সফল হতে হলে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা অপরিহার্য। নাগরিকদের প্রতি আমাদের আহ্বান, তারা যেন সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের উপর নজর রাখে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দাবি করে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অটল থাকে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের গত ১৭ বছরের শাসন আমাদের শিখিয়েছে যে, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে দুর্নীতি ও সামাজিক অবিচার অবশ্যম্ভাবী। একটি সরকার যখন জনগণের কণ্ঠকে দমন করে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে, তখন তা কেবল জনগণের অধিকারই কেড়ে নেয় না, বরং দেশের অগ্রগতিকেও বাধাগ্রস্ত করে। জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, জনগণের ঐক্য এবং সচেতনতাই গণতন্ত্রের প্রকৃত রক্ষাকবচ। আমাদের দায়িত্ব হলো এই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।




