চাঁদপুর সকাল

বিশ বছর, দুই তত্ত্বাবধায়ক সরকার, এক সত্য : পর্দার আড়াল থেকে স্মৃতিচারণ

৩ মাস আগে
বিশ বছর, দুই তত্ত্বাবধায়ক সরকার, এক সত্য : পর্দার আড়াল থেকে স্মৃতিচারণ
আলী হায়দার, প্রধান সম্পাদক ও প্রযুক্তি প্রকৌশলী, সাপ্তাহিক চাঁদপুর সকাল


২৮ ডিসেম্বর, ২০০৬-এই তারিখটি আমার স্মৃতিতে এখনো বেশ জ্বলজ্বলে। দিনটি কেবল মফস্বলের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্মতারিখ ছিল না; বরংচ বলা যায় ছিল এক নীরব আত্মবিশ্বাসের সূচনা।

হঠাৎ ভাবলে মনে হবে, সেটি যেন এক জীবনেরও বেশি আগের কথা। আর আজকের জাতীয় বাস্তবতার দিকে তাকালে, ইতিহাস যেন এক বৃত্তে ঘুরে এসেছে বলে মনে হয়।

কিছুটা কাকতালীয় বলা যায়, সাপ্তাহিক চাঁদপুর সকাল-এর জন্ম হয় এমন এক সময়ে, যখন দেশ দাঁড়িয়ে ছিল কঠিন এক সময়ে। বাংলাদেশ তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। যারা সেই সময়টা প্রত্যক্ষ করেছেন, তারা নিশ্চয়ই পরিবেশটি মনে করতে পারবেন। সেটি কেবল নির্বাচনী উত্তেজনা ছিল না; ছিল অগ্নিগর্ভের মতো পরিস্থিতি। কাগজে কি লেখা যাবে, কি লেখা যাবে না-এমন সব বিষয় নিয়ে ছিল বিতর্ক ও ভয়।

ঠিক এমনই এক উত্তপ্ত ও অনিশ্চিত পরিবেশের মধ্যেই প্রকাশিত হয় চাঁদপুর সকাল-এর প্রথম সংখ্যা।

ঠিক বিশ বছর পর ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এ পত্রিকাটি পূর্ণ করে তার বিশ বছর। আর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতে, দেশ আবারও একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিতে। চরিত্র বদলেছে, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছে, প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কাঠামো আমূল বদলে দিয়েছে, তবু গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত ছন্দ, সেই অপেক্ষা, সেই রূপান্তর, এবং বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতার তীব্র প্রয়োজন আজও প্রায় অপরিবর্তিত।

২০২৫ সাল থেকে ফিরে তাকিয়ে, বিশেষ করে রাজনৈতিক সংকটের সেই সময়ে, ২০০৬ সালে একটি পত্রিকা প্রকাশ করার অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মকে বোঝানো সত্যিই কঠিন।

আজ আমরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার যুগে বাস করি। কিন্তু তখন একটি পত্রিকা প্রকাশ করা মানে ছিল চরম ধৈর্য এবং শারীরিক অধ্যবসায়ের পরীক্ষা। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এমন ছিল যে, কাগজ পরিবহন করা বা ছাপা কপি বিতরণ করাই অনেক সময় রাস্তাঘাটের কর্মসূচি ও হরতালের বিরুদ্ধে এক লজিস্টিক লড়াই হয়ে দাঁড়াত।

কোনো ক্লাউডভিত্তিক এডিটোরিয়াল টুল ছিল না, যেখানে দূর থেকে সবাই একসাথে কাজ করতে পারত। স্মার্টফোনে গুগল করে মুহূর্তেই তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। খবর এক ক্লিকের গতিতে ছড়াত না; ছড়াত মানুষের সমন্বয়ের গতিতে।

আমরা ছিলাম এই শিল্পের নতুন মানুষ এবং কঠিন পথেই আমাদের শিখতে হয়েছে। পত্রিকা প্রকাশ ও ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রক্রিয়াটি বরাবরই ছিল কঠিন ও ক্লান্তিকর। তথ্য সংগ্রহ, তথ্যের উৎস যাচাই, ধীরগতির কম্পিউটারে লেখা সম্পাদনা, হাতে-কলমে লেআউট তৈরি, এবং প্রেসের সঙ্গে সমন্বয় - প্রতিটি ধাপেই লাগত সচেতন ও পরিশ্রমী প্রচেষ্টা। ভুলের মূল্য ছিল চড়া। প্রকাশের পর আর সম্পাদনার সুযোগ থাকত না।

এই বিশৃঙ্খল প্রচেষ্টার কেন্দ্রে ছিলেন সাপ্তাহিক চাঁদপুরসকাল-এর সম্পাদক ও প্রকাশক, অধ্যক্ষ মোশাররফ হোসেন লিটন। তিনি ছিলেন অধ্যাপক, তার পটভূমি ছিল শিক্ষা ও শিক্ষকতার, আর সেটি তার কাজেই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো। তিনি গণমাধ্যমের খ্যাতির কোলাহল কিংবা বাণিজ্যিক চাপ দ্বারা পরিচালিত ছিলেন না। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়, যখন উচ্চস্বরে কথা বলাই অনেক সময় গুরুত্ব পায়, তিনি সেখানে নিয়ে এসেছিলেন একটি ভিন্ন চেষ্টা।

তার সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল অসংখ্য। আর্থিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট লজিস্টিক সমস্যা, এবং প্রতিষ্ঠিত মহলের সংশয় — অনেকে বিশ্বাসই করতেন না যে এমন সময়ে একটি নতুন সাপ্তাহিক টিকে থাকতে পারবে। তবুও, আমাদের সবার চোখে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল, তা হলো তার আত্মবিশ্বাস। আমার সাথে এক বৈঠকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম - “শখের বসে পত্রিকা বের করছেন না তো?” তিনি দৃঢ়ভাবেই ব্যক্ত করেছিলেন এই পত্রিকার অস্তিত্বে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।

প্রথম সংখ্যাটি একদিনে আসেনি। প্রায় কয়েক সপ্তাহের নির্ঘুম ও তীব্র প্রস্তুতির ফল ছিল সেটি।

আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে আমরা পুরোপুরি নিজস্ব বিবেচনার ওপর নির্ভর করতাম। প্রতিটি শিরোনাম নিয়ে ভাবা হতো। প্রতিটি অনুচ্ছেদ মানুষের চোখে খুঁটিয়ে দেখা হতো — কোনো ব্যাকরণ পরীক্ষা করার সফট্ওয়্যার ছিল না। ল্যান্ডফোন বা মোবাইলে কল, হাতে লেখা নোট, ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, আর চায়ের কাপের পাশে দীর্ঘ আলোচনা-এসবই ছিল আমাদের ভরসা।

আমার নিজের ভূমিকা ছিল মূলত পর্দার আড়ালে। সংবাদপত্র জগতের বাইরে একাধিক দায়িত্ব থাকায় আমার ভূমিকা ছিল অনেকটাই অদৃশ্য। শারীরিক ও মানসিকভাবে এটি ছিল অত্যন্ত চাপের সময়। তবু আজও স্পষ্ট মনে আছে, যখন শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি বের হলো। কাগজে কালি ছোঁয়া, নতুন ছাপা কপিগুলো হাতে নেওয়া-তার ছিল এক আলাদা ওজন, কাগজ আর রাসায়নিকের গন্ধ, এবং এমন এক সম্মিলিত অর্জনের অনুভূতি, যা কোনো ডিজিটাল অ্যানালিটিক্স ড্যাশবোর্ড কখনো দিতে পারবে না।

আমরা ক্লান্ত ছিলাম নিঃসন্দেহে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল গর্ব।

২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার সাংবাদিকতা ছিল ধীরগতির। কিন্তু আজ ফিরে তাকিয়ে বুঝি, সেই ধীরতা কোনো দুর্বলতা ছিল না; বরং তা ছিল এক ধরণের সেফগার্ড।

যাচাই করতে সময় লাগত। একাধিক উৎস মিলিয়ে দেখা ছিল হাতে-কলমে কাজ। এমন অস্থির রাজনৈতিক সময়ে যাচাই না করা গুজব প্রকাশ করা শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, ভয়ংকর ছিল। কারণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই নৈতিকতা গেঁথে ছিল। শর্টকাট নেওয়ার সুযোগই ছিল না। সময় দিতেই হতো।

আজকের দিনে এসে দৃশ্যপট প্রায় অচেনা। হাজার হাজার অনলাইন পোর্টাল এক মুহূর্তের মনোযোগের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর, সঠিক হোক বা ভুল মিনিটের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি তথ্যকে করেছে প্রাচুর্যময়, কিন্তু হাতে পাওয়াকে করেছে সহজ। একজন প্রযুক্তি প্রকৌশলী হিসেবে আমি এই ব্যবস্থার পেছনের কোড দেখে মুগ্ধ হই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এখন একটি খবর তৈরি করতে সময় লাগে এক কাপ চা বানানোর চেয়েও কম।

তবু একজন সম্পাদক হিসেবে আমি উদ্বিগ্ন। এই সহজলভ্যতার মূল্য আমরা দিচ্ছি। সবার আগে হওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক সময় সঠিক হওয়ার দায়িত্বকে ছাপিয়ে যায়। যাচাইয়ের জায়গায় আসে ভাইরাল হওয়ার তাড়না। গতির কাছে বলি হয় প্রেক্ষাপট। এক সময় খবর যাচাইয়ের যে নৈতিক চেষ্টা স্বাভাবিক ছিল, সেগুলো আজ আর নেই। তার জায়গা নিয়েছে এআই দক্ষতা।

এই স্মৃতিচারণ মোটেই প্রযুক্তির প্রত্যাখ্যান নয়। আমি সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করছি গত ১৮ বছর। প্রযুক্তি আমার দৈনন্দিন জীবনের অংশ। আমি জানি, প্রযুক্তি সাংবাদিকতাকে সত্যিই অনেকভাবে শক্তিশালী করেছে, বিস্তৃত করেছে পাঠকগোষ্ঠী, দিয়েছে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ এবং উন্নত অনুসন্ধানী সরঞ্জামও। এখন কত্তো সহজ যে কোনো বিষয়ে রিসার্চ করা যায়।

কিন্তু আমি মনে করি যে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারে দ্রুত সংবাদ লেখা বা পত্রিকা প্রকাশ যথেষ্ট নয়।

একজন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব মানে বিশ্বাসযোগ্যতার বিনিময়ে ক্লিকের পেছনে না ছোটা। একজন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব মানে ভাষা, প্রেক্ষাপট ও ভারসাম্যের সততা রক্ষা করা, যখন এআই-এর অ্যালগরিদম আদত মানুষের এক্সাইটমেন্টকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়। একজন পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে দায়িত্ব মানে এই উপলব্ধি তৈরি করা যে সব তথ্যই সাংবাদিকতা নয় আর সব দ্রুত গতিই উন্নতি নয়।

আর ২০০৬ সালে পর্দার আড়ালে কাজ করা আমার সেই তরুণ দৃষ্টিকোণ থেকে এখনো আমি মনে করি-সাংবাদিকতা কত দ্রুত খবর প্রকাশ করল, তা দিয়ে নয়; বরং কত নিষ্ঠার সঙ্গে সত্যের সেবা করল, তা দিয়েই তার মূল্য নির্ধারিত হয়।

২৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এ সাপ্তাহিক চাঁদপুর সকাল বিশ বছরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আমরা কোথা থেকে এসেছি এবং কী হারানো চলবে না।

২০০৬ সালের শেষের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রেক্ষাপটেও তথ্য খুঁজে পাওয়া, যাচাই করা সহজ ছিল কিন্তু প্রকাশ করা ছিল ভারী দায়িত্ব এবং জবাবদিহিতা ছিল। আজ, আরেকটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশ এবং তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সর্বত্র। যাচাইটাই হয়ে গেছে ঐচ্ছিক। সত্য কিংবা মিথ্যা প্রকাশ করা অত্যন্ত সহজ। তবু দায়িত্ব বদলায়নি।

সরকার বদলাবে, নির্বাচন আসবে ও যাবে, প্রযুক্তি আরও রূপ নেবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হবে আরও দ্রুত, আরও বুদ্ধিমান, আরও বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু আসল সাংবাদিকতা, চিরকালই নির্ভর করবে মানবিক মূল্যবোধের ওপর: সততা, জবাবদিহিতা, ধৈর্য এবং সাহস।

এই মূল্যবোধগুলোই একসময় সাপ্তাহিক চাঁদপুর সকাল-এর শুরুর দিনের ছোট্ট নিউজরুমে বিদ্যমান ছিল।

বিশ বছর পরে যখন জাতি আবারও এক সংকট পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, সেই দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

পরিশেষে সাপ্তাহিক চাঁদপুর সকাল–এর ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পত্রিকার সকল পাঠক, সংবাদদাতা, শুভানুধ্যায়ী ও কলাকুশলীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। পত্রিকাটি নিজস্ব গতিতে পাঠকের মনে হাজার বছর বেচে থাকুক এই কামনা করি।