সাংবাদিকদের নিরাপত্তা—গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষার শর্ত

গাজীপুরে কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া এক সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিল, সংবাদ পেশা এখনো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। জনসমক্ষে ছুরিকাঘাতে একজন প্রতিবেদককে হত্যা—এটি শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, বরং সারা দেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য এক বড় ধাক্কা। সাংবাদিকরা প্রতিদিন মাঠে ঘুরে, নানা হুমকি উপেক্ষা করে জনগণের কাছে সত্য খবর পৌঁছে দেন। তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক কর্তব্য।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে হামলা, হয়রানি ও হত্যার ঘটনা নতুন কিছু নয়। আমরা ভুলতে পারি না ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াবহ দিন, যখন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের হত্যার বিচার এখনো শেষ হয়নি, যা আমাদের বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং সাংবাদিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এর আগেও খুলনার সাংবাদিক মানিক চন্দ্র সাহাকে বোমা মেরে হত্যা করা হয়েছিল, আর ফেনীর টিপু সুলতানকে আগুনে পোড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল শুধুমাত্র তার সাহসী প্রতিবেদন লেখার কারণে।
তবে এর মাঝেও স্বীকার করতেই হবে, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে। সংবাদকর্মীদের প্রতি সম্মান দেখানো, মাঠে কাজ করা সাংবাদিকদের জন্য সুরক্ষা নির্দেশনা জারি, এবং কিছু ঘটনায় দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার—এসবই সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ। অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেই দেখা গেছে, সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় এবং ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় কর্মরতদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
তবুও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। Ain o Salish Kendra (ASK)-এর তথ্য বলছে, গত এক বছরে প্রায় চারশ’ সাংবাদিক শারীরিক হামলা, ভয় দেখানো বা আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। Transparency International Bangladesh-এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শুধুমাত্র গত বছরেই তিনজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে এবং শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সতর্ক করেছে যে, সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ ও হয়রানির ঘটনা বেড়েছে এবং এর সাথে আইনের অপব্যবহারও দেখা যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, সাংবাদিকদের উপর যেকোনো হামলার তদন্ত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে শেষ করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে উঠবে। দ্বিতীয়ত, মাঠে কাজ করা সাংবাদিকদের জন্য সঠিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আইনের সংস্কার জরুরি—যাতে কোনো সাংবাদিক তাদের কাজের জন্য অযথা হয়রানির শিকার না হন, আবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও কোনো বাধা না থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীকে রক্ষা করা নয়—এটি মানে গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা এবং জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার রক্ষা করা। কারণ সংবাদমাধ্যম যদি ভয়মুক্ত না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষও সত্য জানতে পারবে না।
সাগর-রুনি থেকে শুরু করে গাজীপুরের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড—এসব ঘটনা আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে যে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। সরকার, সংবাদমাধ্যম, এবং নাগরিক সমাজ—সবার মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারের নেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোকে আরও জোরদার করতে হবে, যাতে প্রতিটি সাংবাদিক নিশ্চিন্তে, নির্ভয়ে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। এটাই হবে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে বড় ভিত্তি।




