ডাকসু ২০২৫: শিক্ষার্থীরা কথা বলেছে, রাজনীতিবিদরা কি শুনবে?

২০২৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন দেশের শিক্ষাঙ্গন এবং রাজনীতির ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অনেক বছর পর শিক্ষার্থীরা ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ পেল। ভোটকে ঘিরে প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল উত্তেজনা ও কৌতূহল। প্রশাসনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগাম কিছু সংশয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা একে মোটের ওপর সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিয়েছে। এই স্বীকৃতিই সবচেয়ে বড় অর্জন, কারণ দীর্ঘদিন পর শিক্ষার্থীরা একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করতে পেরেছে।
ভোটের ফলাফল নিয়ে যেন সারা দেশ আলোচনায় মেতে উঠেছে। ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল যেভাবে বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে, তা সত্যিই অপ্রত্যাশিত। তারা ২৮টি কেন্দ্রীয় পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩টিতে জয়ী হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট, জেনারেল সেক্রেটারি, সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদও তারা নিজেদের দখলে নিয়েছে। এত বড় জয় কেবল সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, প্রতীকীভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সংগঠন ও পরিকল্পনা যদি মজবুত হয়, প্রচারণা যদি শিক্ষার্থীদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায়, তবে যে কেউ আস্থা অর্জন করতে পারে।
অন্যদিকে, যারা এতদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই প্রথাগত ছাত্র সংগঠনগুলো এবার ব্যর্থতার মুখে পড়েছে। তাদের প্রচারণা ছিল দুর্বল, অনেক জায়গায় অগোছালো, এবং সবচেয়ে বড় কথা তারা শিক্ষার্থীদের চোখে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। এতদিন তারা ধরে নিয়েছিল, বড় রাজনৈতিক দলের নাম, ইতিহাস আর অতীতের শক্তি দিয়ে সহজেই শিক্ষার্থীদের সমর্থন পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা প্রমাণ করল, এখন আর শিক্ষার্থীরা শুধু নাম বা ইতিহাস দেখে ভোট দেয় না। বরং তারা দেখে কে বাস্তবে তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে, কে তাদের কথা শুনবে, আর কে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত করতে কাজ করবে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আসলে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তারা বলেছে, “আমরা আর অন্ধভাবে দলীয় আনুগত্যে ভরসা করি না। আমরা চাই বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব।” এই মনোভাব নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের অনেকেই ডাকসুর এই ভোটে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছে। তাদের ভোটে প্রকাশ পেয়েছে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
ডাকসুর ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে এখানে যা ঘটে, তা জাতীয় রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন—সবক্ষেত্রেই ডাকসুর ভূমিকা ছিল নেতৃত্বদায়ক। তাই এবারের নির্বাচনকে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এক ধরনের সতর্কবার্তা। যদি তারা তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারে, ছাত্র সংগঠনগুলোকে নতুন করে প্রাণবন্ত না করতে পারে এবং তরুণদের আস্থা পুনর্গঠন করতে না পারে, তবে তাদের ভবিষ্যৎও সংকটময় হয়ে উঠবে। ছাত্র সংগঠন আসলে রাজনৈতিক দলের শিকড়। সেই শিকড় দুর্বল হয়ে গেলে বড় গাছও শুকিয়ে যায়।
শিবিরের এই জয়কে কেউ কেবল মতাদর্শের সাফল্য বললে ভুল করবে। এটি শিক্ষার্থীদের ভিন্ন কণ্ঠস্বর খোঁজার ফলাফল। অনেক দিন ধরে শিক্ষার্থীরা মনে করেছে, একই ধরনের নেতৃত্ব ঘুরেফিরে তাদের সামনে হাজির হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। এবার তারা সুযোগ পেয়েই অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এভাবেই আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে নেতৃত্বের পালাবদল ঘটেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি এক বড় শিক্ষা। তারা যদি মনে করে পুরোনো ধারা ধরে রেখে তরুণদের জয় করা যাবে, তবে তারা ভুল করছে। তরুণরা এখন অনেক বেশি সচেতন, তারা নিজেরা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের কাছে প্রতিশ্রুতি নয়, কাজের প্রমাণই মুখ্য। তাই দলের নাম, ঐতিহ্য বা প্রভাব দিয়ে ভোট পাওয়ার দিন শেষ। বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকর ভূমিকা ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো সংগঠনই শিক্ষার্থীদের সমর্থন পাবে না।
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচন তাই কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভোট নয়। এটি একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা। শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিয়েছে, তারা পরিবর্তন আনতে সক্ষম, তারা নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য নতুন দিক বেছে নিতে প্রস্তুত। রাজনৈতিক দলগুলো যদি এই বার্তা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে জাতীয় রাজনীতিতেও তারা একদিন একই ধরনের ধাক্কা খাবে।
সবশেষে বলা যায়, ডাকসু নির্বাচন ছিল শিক্ষার্থীদের আস্থার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যে দল শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস জিততে পেরেছে, তারাই জয়ী হয়েছে। এই শিক্ষাই জাতীয় রাজনীতির জন্যও প্রযোজ্য। জনগণের আস্থা ছাড়া ক্ষমতা টেকসই নয়। ডাকসু সেই বার্তাই আবারও তুলে ধরল—যারা আস্থা জিতবে, তারাই টিকবে। আর যারা আস্থা হারাবে, তাদের বিদায় অবশ্যম্ভাবী।




