চাঁদপুর সকাল

ঐতিহাসিক দিনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ : কাল ব্যালটে ফিরছে গণতন্ত্র

প্রায় ১৬ ঘন্টা আগে
ঐতিহাসিক দিনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ : কাল ব্যালটে ফিরছে গণতন্ত্র
জাতির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন; যে নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশে বিরাজ করছে আশার আলো, উৎসবের আমেজ এবং বহুদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগের এক অনন্য উত্তেজনা ও আনন্দ।

শহর থেকে গ্রাম, পাড়া থেকে চা-স্টল, সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রে আগামীকালের ভোট। বহু মানুষের কাছে এটি কেবল একটি নির্বাচন নয়; বরং দীর্ঘদিন পর প্রকৃত অর্থে নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার এক আনন্দঘন মুহূর্ত। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে এই অনুভূতি আরও তীব্র।

আগামীকালের নির্বাচন কোনো সাধারণ ভোট নয়। এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেশের মানুষ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিতর্কিত নির্বাচন এবং অংশগ্রহণহীনতার অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে সামনে তাকাতে চাইছে।

২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েকটি ভোটকে ঘিরে ছিল বর্জন, কম ভোটার উপস্থিতি, সহিংসতা ও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন। এসব অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি গভীর অনাস্থা তৈরি করেছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনকে তাই সেই বাস্তবতার পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেই দেখছেন অনেকেই।

এই পরিবর্তনের সূচনা ঘটে ২০২৪ সালে। দেশজুড়ে ছাত্র ও জনআন্দোলনের পর দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সরকারের পতন ঘটে। সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে আছেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এই সরকার শুরু থেকেই একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের অঙ্গীকার করে।

এই নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। দীর্ঘদিন প্রভাবশালী থাকা আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। ফলে নির্বাচনী মাঠে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে; যা ভোটারদের সামনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটির বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছর। এই তরুণ ভোটারদের একটি বিশাল অংশ তাদের জীবনে প্রথমবারের মতো একটি ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে যারা কিশোর ছিল, ২০২৪ সালে যারা প্রথম ভোট দেওয়ার যোগ্য হয়েও ভোট দিতে পারেনি, তাদের কাছে এই নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি এক উৎসব।

এই প্রজন্মই ছিল ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে যে আন্দোলন রূপ নিয়েছিল সরকার পতনের গণআন্দোলনে, সেখানে দিনের পর দিন প্রখর রোদ ও বৃষ্টির মধ্যে রাজপথে দাঁড়িয়ে এই Gen Z তাদের জীবন বাজি রেখেছিল একটি স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের দাবিতে।

সেই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার এবং গৃহীত হয় ‘জুলাই সনদ’—যা আগামী দিনের রাজনীতিতে জবাবদিহিতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে। এই সনদ অনুযায়ী, আগামীকালের নির্বাচনে শুধু জনপ্রতিনিধিই নির্বাচিত হবে না; একই সঙ্গে এই সনদের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

এই Gen Z ভোটারদের কাছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সুযোগ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তারা কেবল উন্নয়নের গল্প শুনতে চায় না—তারা চায় একটি সুষম, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।

নির্বাচনকে ঘিরে জনজীবনে উৎসবের ছোঁয়া স্পষ্ট। পাড়া-মহল্লা পোস্টার ও ব্যানারে সজ্জিত, দোকানে বিক্রি হচ্ছে জাতীয় পতাকা ও ভোটার সচেতনতামূলক ব্যাজ। অনেক পরিবার একসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে—ঠিক যেমন ঈদের দিন আত্মীয়দের সঙ্গে বের হওয়া হয়।

চা-স্টলে আলোচনার বিষয় এখন রাজনীতি, ভবিষ্যৎ সরকার, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি। বিতর্ক আছে, মতভেদ আছে—তবে আছে কথা বলার স্বাধীনতা এবং অংশগ্রহণের আগ্রহ।

নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্য ভোটকেন্দ্র ও আশপাশে দায়িত্ব পালন করবেন, যাতে ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোও মাঠে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পরিবেশ শান্তিপূর্ণ এবং ভোটগ্রহণের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন।

যদিও মানুষের মধ্যে আনন্দ ও আশা প্রবল, তবুও অনেকেই মনে করছেন—এই নির্বাচন শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলাফল গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং পরবর্তী শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরই হবে প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড।

তবুও সাধারণ মানুষের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি শোনা যাচ্ছে, তা হলো—

“ভোট দিতে পারাটাই আমাদের জন্য বড় অর্জন।”

আগামীকাল, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, বাংলাদেশের Gen Z তাদের আঙুলের কালিতে কেবল একটি দাগ দেবে না—তারা লিখবে এক নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এটি কেবল একটি ভোট নয়; এটি একটি প্রজন্মের আশা, স্বপ্ন ও প্রতিবাদের নতুন ঠিকানা।

১২ ফেব্রুয়ারির সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের কোটি কোটি মানুষ ভোটকেন্দ্রের পথে হাঁটবে—কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ রিকশায়, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। অনেকের চোখে এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি গণতন্ত্রে ফিরে আসার এক প্রতীকী দিন।