জুলাই গণ অভ্যুত্থান: এক রক্তাক্ত গণজাগরণ, এক জাতির নতুন সূচনা

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, কিন্তু সেই রক্তের বিনিময়ে জাতি একটি নতুন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল। এটি ছিল জুলাই গণ অভ্যুত্থান, যা ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান বা মৌসুমী বিপ্লব নামে পরিচিত। যা শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হিসেবে, তা শেখ হাসিনার ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় গণ অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই আন্দোলনে প্রায় ১৫০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন, যার মধ্যে ১২-১৩% শিশু, এবং ২০,০০০-এর বেশি আহত হয়েছেন। এই নিবন্ধে আমরা সেই শহীদদের স্মরণ করছি, তাদের ত্যাগের গল্প তুলে ধরছি এবং জুলাই গণ অভ্যুত্থানের বিস্তারিত সময়রেখা ও প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করছি।
একটি জাতির নিঃশ্বাসরুদ্ধ জীবন
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বয়কট করে, এবং সরকার বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও মামলার মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো আইনের মাধ্যমে মুক্ত মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, এবং মূল্যস্ফীতি জনগণের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩ সালের দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম স্থানে ছিল। এই পরিস্থিতিতে, ২০২৪ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায় জনগণের ক্ষোভকে উসকে দেয়।
২০১৮ সালে ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে সরকার সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার করে। কিন্তু ২০২১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা এই সংস্কারের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট এই সংস্কারকে অবৈধ ঘোষণা করে, যার ফলে ৩০% কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য পুনর্বহাল হয়। ছাত্ররা এই রায়কে বৈষম্যমূলক এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের পথে বাধা হিসেবে দেখে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে একটি জোট গঠিত হয়, যারা মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং সমান সুযোগের দাবি নিয়ে রাস্তায় নামে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়রেখা : জুন ৫ - আগস্ট ৫, ২০২৪
জুন ৫, ২০২৪: একটি রায়, একটি স্ফুলিঙ্গ
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ, বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের এবং খিজির হায়াতের বেঞ্চে, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার সার্কুলারকে অবৈধ ঘোষণা করে। এর ফলে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য ৩০% কোটা পুনর্বহাল হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু করে।
কোটা ব্যবস্থায় মোট ৫৬% চাকরি সংরক্ষিত ছিল—৩০% মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধর, ১০% নারী, ১০% অনগ্রসর জেলার বাসিন্দা, ৫% আদিবাসী এবং ১% শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য। ছাত্ররা এই ব্যবস্থাকে অযৌক্তিক এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখে। তরুণরা রাস্তায় নামে, তাদের স্লোগান ছিল: “কোটা নয়, মেধার ভিত্তিতে চাকরি!”
জুন ৬-১৬, ২০২৪: প্রতিবাদের প্রাথমিক ঢেউ
প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে, তবে ঈদুল আজহার উৎসব এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটির কারণে এর গতি কিছুটা মন্থর হয়। ঢাকায় ছাত্ররা শাহবাগ এবং সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের দাবি স্পষ্ট করে: কোটা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ।
মানুষের গল্প: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফারজানা, যিনি একটি গ্রামীণ পরিবার থেকে এসে মেধার জোরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, বলেন, “আমরা চাই আমাদের পরিশ্রমের মূল্যায়ন হোক। কোটা আমাদের স্বপ্নকে বাধা দেয়।” তার মতো হাজারো তরুণ এই আন্দোলনে যোগ দেয়।
জুলাই ১, ২০২৪: বাংলা ব্লকেডের সূচনা
ঈদের পর প্রতিবাদ নতুন উদ্যমে শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন “বাংলা ব্লকেড” ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর, রাজশাহী এবং বগুড়ায় রাস্তা ও রেলপথ অবরোধ করা হয়। ঢাকার শাহবাগ, মিরপুর এবং উত্তরায় হাজারো ছাত্র জড়ো হয়।
সরকারের প্রতিক্রিয়া: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবাদকে “অযৌক্তিক” বলে উড়িয়ে দেন এবং ছাত্রদের সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে বলেন। তার এই মন্তব্য ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ায়।
জুলাই ২-৩, ২০২৪: আন্দোলনের বিস্তার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ তীব্র হয়। ঢাকায় শাহবাগ চত্বরে হাজারো ছাত্র জড়ো হয়, “মেধার মূল্যায়ন চাই, বৈষম্য নয়” স্লোগানে রাস্তা মুখরিত হয়।
মানুষের গল্প: মিরপুরের রাস্তায় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আহমেদ, একজন প্রথম বর্ষের ছাত্র, বলেন, “আমার বাবা একজন রিকশাচালক। আমি পড়াশোনা করে জীবন বদলাতে চাই, কিন্তু কোটা আমার স্বপ্নকে ছিনিয়ে নিচ্ছে।” তার কণ্ঠে ক্ষোভ আর অধ্যবসায়ের মিশ্রণ ছিল।
জুলাই ৪, ২০২৪: সুপ্রিম কোর্টের স্থিতাবস্থা
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে, তবে চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করে। এর মানে কোটা ব্যবস্থা অস্থায়ীভাবে স্থগিত থাকবে।
ছাত্রদের প্রতিক্রিয়া: ছাত্ররা এই স্থিতাবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে, বলে যে এটি “সময় কেনার কৌশল”। তারা কোটা সম্পূর্ণ বিলুপ্তির দাবি জানায়।
জুলাই ৬-৭, ২০২৪: বাংলা ব্লকেড তীব্র হয়
বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি তীব্র হয়। ঢাকায় ছয়টি প্রধান চত্বর—শাহবাগ, মিরপুর-১০, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, উত্তরা, মোহাম্মদপুর এবং ফার্মগেট—অবরোধ করা হয়। ছাত্ররা রেললাইনের উপর বসে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়। চট্টগ্রামে বন্দর এলাকায় অবরোধ হয়।
মানুষের গল্প: রংপুরের একটি অবরোধে অংশ নেওয়া রিফাত, একজন কলেজ ছাত্র, বলেন, “আমরা রাস্তায় বসে আছি, কারণ আমাদের কণ্ঠ শোনা হচ্ছে না। এই দেশ আমাদের, আমরা এটি বদলাতে চাই।”
জুলাই ১০, ২০২৪: প্রথম সংঘর্ষ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিক্ষোভ মিছিল গ্রন্থাগার থেকে শুরু হয়ে রাজু স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়। পুলিশ প্রথমবারের মতো ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। টিয়ার গ্যাস এবং রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়, কয়েকজন ছাত্র আহত হয়।
এই ঘটনা ছাত্রদের মধ্যে ভয়ের পরিবর্তে ক্ষোভ জাগায়। সামাজিক মাধ্যমে QuotaReform হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং হয়।
জুলাই ১৪, ২০২৪: “রাজাকার” মন্তব্য এবং ক্ষোভের জন্ম
গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা প্রতিবাদকারীদের “রাজাকারের সন্তান” বলে অভিহিত করেন। এই মন্তব্য ছাত্রদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যরাতে বিক্ষোভ শুরু হয়। নারী ছাত্ররা হলের তালা ভেঙে রাস্তায় নামে, “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার” এবং “কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!” স্লোগান দেয়।
সহিংসতা: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ প্রতিবাদকারীদের উপর হামলা করে, ১৩ জন আহত হয়। সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৪জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়।
জুলাই ১৫, ২০২৪: রক্তাক্ত দিনের সূচনা
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে “যোগ্য জবাব” দেওয়ার নির্দেশ দেন। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত ছাত্রদের উপর হামলা করে। রড এবং চাইনিজ কুড়াল নিয়ে ছাত্রলীগ হাসপাতালে প্রবেশ করে এবং অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করে। কমপক্ষে ৩০০ জন আহত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং রংপুরে সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হয়, যার মধ্যে রংপুরে আবু সায়েদ নামে একজন ছাত্র পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে।
মানুষের গল্প: আবু সায়েদের মৃত্যু জাতির হৃদয় ভেঙে দেয়। তার বন্ধু রাকিব বলেন, “সায়েদ শুধু কোটার বিরুদ্ধে লড়ছিল না, সে আমাদের স্বপ্নের জন্য লড়ছিল। তার রক্ত বৃথা যাবে না।”
জুলাই ১৬, ২০২৪: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগদান
প্রাইমএশিয়া, ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, এআইইউবি, নর্থ সাউথ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলনে যোগ দেয়। রামপুরা, কুড়িল বিশ্ব রোড এবং প্রগতি সরণিতে তীব্র সংঘর্ষ হয়। সরকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছাত্রদের খালি করতে বলে।
মৃত্যু: পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহত হয়, যা আন্দোলনের প্রথম নিশ্চিত মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত হয়। ছাত্ররা নিহতদের জন্য “গায়েবানা জানাজা” আয়োজনের চেষ্টা করে, কিন্তু পুলিশ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই জানাজা আক্রমণ করে। কমপক্ষে ৩০ ছাত্র নিহত হয়।
জুলাই ১৭, ২০২৪: পূর্ণ শাটডাউন
ছাত্ররা “পূর্ণ শাটডাউন” ঘোষণা করে, যার ফলে ঢাকাসহ ৪৭টি জেলায় পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ এবং অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৯ জন নিহত হয়। সরকারি ভবন, বাংলাদেশ টেলিভিশন কেন্দ্র এবং যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণে মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের ঘোষণা দেন।
হ্যাকিং: প্রতিবাদকারীদের সমর্থনে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়।
জুলাই ১৮, ২০২৪: ইন্টারনেট শাটডাউন
সরকার দেশব্যাপী ইন্টারনেট শাটডাউন শুরু করে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়। ঢাকা মেট্রোর মিরপুর-১০ এবং কাজীপাড়া স্টেশন ভাঙচুর করা হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ গুলি চালায় এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। মোহাখালীতে আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ করে।
অভিযোগ: বিবিসি আই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি ফাঁস হওয়া কলে শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রতিবাদকারীদের উপর “মারাত্মক অস্ত্র” ব্যবহারের নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ। এই অভিযোগ যাচাই করা যায়নি।
মানুষের গল্প: মির মুগ্ধ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্র, পানি এবং বিস্কুট বিতরণ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার যমজ ভাই ফেসবুকে একটি আবেগঘন ভিডিও পোস্ট করেন, যা দেশব্যাপী ভাইরাল হয়।
জুলাই ১৯, ২০২৪: কারফিউ এবং সেনা মোতায়েন
মধ্যরাতে দেশব্যাপী “শ্যুট-অ্যাট-সাইট” কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। ঢাকায় ৪৪ জনসহ ৬৬ জন নিহত হয়। নরসিংদী জেল, মেট্রো রেল স্টেশন এবং বিআরটিএ অফিস ভাঙচুর করা হয়। ১১ বছর বয়সী শাফকাত সামিরের মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক হয়, কেউ কেউ দাবি করে তাকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়েছিল। র্যাব এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
ইউনিসেফের বিবৃতি: ইউনিসেফ ৩২ শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার জন্য ত্বরিত ব্যবস্থার আহ্বান জানায়।
জুলাই ২১, ২০২৪: সুপ্রিম কোর্টের রায়
সুপ্রিম কোর্ট মুক্তিযোদ্ধাদের কোটাকে ৫%-এ নামিয়ে আনে, ৯৩% চাকরি মেধাভিত্তিক এবং ২% অন্যান্য শ্রেণির জন্য বরাদ্দ করে। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কারফিউর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের শুনানি।
ছাত্রদের প্রতিক্রিয়া: ছাত্ররা রায় প্রত্যাখ্যান করে, সহিংসতার জন্য দায়ীদের শাস্তি, ছাত্রলীগের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং হাসিনার পদত্যাগ দাবি করে।
জুলাই ২৩, ২০২৪: ইন্টারনেট পুনরুদ্ধার
পাঁচ দিনের সম্পূর্ণ ইন্টারনেট শাটডাউনের পর সরকার কিছু এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পুনরুদ্ধার করে।
মানুষের গল্প: সামাজিক মাধ্যমে পুলিশি নৃশংসতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আশুলিয়া থানার কাছে পুলিশ মৃতদেহ ভ্যানে উঠাচ্ছে, যা জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জাগায়।
জুলাই ২৪, ২০২৪: রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা ছাত্রদের আন্দোলন সমর্থন করেছিলেন।
জুলাই ২৫-২৭, ২০২৪: হাসিনার পরিদর্শন
হাসিনা ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রো রেল এবং হাসপাতাল পরিদর্শন করেন, বিরোধী দলকে সহিংসতার জন্য দায়ী করেন। তিনি শান্তিপূর্ণ আলোচনার প্রস্তাব দেন, কিন্তু ছাত্ররা তা প্রত্যাখ্যান করে।
জুলাই ২৮, ২০২৪: ইন্টারনেট পুনরুদ্ধার
১০ দিন পর মোবাইল ইন্টারনেট পুনরুদ্ধার করা হয়। প্রতিবাদ পুনরায় শুরু হয়। সামাজিক মাধ্যমে JulyMassacre এবং RememberingOurHeroes হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং হয়।
জুলাই ২৯, ২০২৪: শিক্ষকদের সমর্থন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সমাবেশ” ছাত্রদের হয়রানি ও গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। শিক্ষকরা নিহত ছাত্রদের জন্য নীরবতা পালন করে। হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা ৩০ জুলাই জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করে, কিন্তু জনগণ এটি প্রত্যাখ্যান করে, সামাজিক মাধ্যমে লাল প্রোফাইল ছবি ব্যবহার করে।
মানুষের গল্প: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা বলেন, “আমরা আমাদের ছাত্রদের পাশে আছি। তাদের রক্তের দাবি আমরা ভুলব না।”
জুলাই ৩০, ২০২৪: জাতীয় শোক দিবস প্রত্যাখ্যান
জনগণ সরকারি শোক দিবস প্রত্যাখ্যান করে। উত্তরা, খুলনা, সিলেট এবং হবিগঞ্জে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়।
জুলাই ৩১, ২০২৪: “শহীদদের স্মরণে” কর্মসূচি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন “শহীদদের স্মরণে” নামে একটি দেশব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করে। রিফাত রশিদের নেতৃত্বে এই কর্মসূচি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্ররা প্রতিবাদী সঙ্গীত সমাবেশ আয়োজন করে।
আগস্ট ১-২, ২০২৪: অসহযোগ আন্দোলন
ছাত্ররা অসহযোগ আন্দোলন জোরদার করে। কর, ইউটিলিটি বিল প্রদান বন্ধ হয়। ছয়জন ছাত্র সমন্বয়ক অভিযোগ করে, তাদের জোরপূর্বক আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল।
আগস্ট ৩, ২০২৪: ঢাকায় দীর্ঘ মিছিল
নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন “ঢাকায় দীর্ঘ মিছিল” ঘোষণা করে। সংঘর্ষে ৯৭ জন নিহত হয়।
আগস্ট ৪, ২০২৪: শাহবাগের রণক্ষেত্র
শাহবাগে লক্ষ লক্ষ বিক্ষোভকারী জড়ো হয়। সংঘর্ষে ৯৫ জন নিহত হয়, যার মধ্যে ১৪ জন পুলিশ। প্রথম আলো ১০০ জনের মৃত্যুর খবর দেয়।
মানুষের গল্প: শাহবাগে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সাবিনা, একজন নারী বিক্ষোভকারী, বলেন, “আমরা ভয় পাইনি। আমাদের ভাই-বোনদের রক্তের জন্য আমরা লড়ছি।” নারীদের অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।
আগস্ট ৫, ২০২৪: বিজয়ের দিন
সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন চানখারপুল এলাকায় লক্ষ লক্ষ বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলা করে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড এবং রাবার বুলেট ব্যবহার করে, কিন্তু কনস্টেবল সুজন হোসেনের মতো কেউ কেউ নির্বিচারে গুলি চালায়, যার ফলে সাতজন নিহত হয়। বিকেল ৩টায় গণভবন ঘেরাও করা হয়। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। সংঘর্ষে ১৩৫ জন নিহত হয়। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে আগুন দেওয়া হয়।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান হাসিনার পদত্যাগ ঘোষণা করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
মানুষের গল্প: ঢাকার রাস্তায় বিজয় উদযাপনকারী তরুণ রাকিব বলেন, “আমরা জিতেছি, কিন্তু এই জয়ের দাম আমাদের ভাই-বোনদের রক্ত। আমরা তাদের ভুলব না।”
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ১৪০০-এর বেশি মানুষ, যার মধ্যে শিশু এবং তরুণ ছাত্ররা ছিলেন, তাদের ত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইউনিসেফের মতে, ৬৬ শিশু এই সহিংসতায় প্রাণ হারায়। ৪০০-এর বেশি ছাত্র তাদের দৃষ্টিশক্তি হারায়, এবং ২০,০০০-এর বেশি আহত হয়। তাদের রক্তের বিনিময়ে জাতি গণতন্ত্রের পথে একটি নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। গণভবনকে “জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর” হিসেবে রূপান্তরের পরিকল্পনা চলছে।
জুলাই গণ অভ্যুত্থানের তাৎপর্য
জুলাই গণ অভ্যুত্থান, যাকে “জেন জি বিপ্লব”ও বলা হয়, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক। এটি শুধু কোটা সংস্কারের জন্য নয়, বরং অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় প্রতিবাদ ছিল। নারীদের অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।
জুলাই গণ অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের জনগণের অদম্য চেতনার প্রমাণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তরুণ প্রজন্মের ঐক্য ও সাহসের মাধ্যমে যেকোনো শৃঙ্খল ভাঙা সম্ভব। তবে, এই বিজয়ের পথে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের ঋণ কখনো শোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের দায়িত্ব হলো তাদের স্বপ্নের একটি ন্যায়বিচারপূর্ণ, গণতান্ত্রিক এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তাদের রক্ত আমাদের পথ দেখাবে, এবং তাদের স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে চিরজাগ্রত থাকবে।




