চাঁদপুর-১ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা শুরু : এগিয়ে রয়েছেন এহসানুল হক মিলন

আগামী ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার আগেই চাঁদপুর জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে প্রচারণার হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এই আগাম প্রস্তুতির ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরতে সাপ্তাহিক চাঁদপুর সকাল শুরু করেছে “নির্বাচনের হাওয়া” নামে একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে এই ধারাবাহিকের প্রথম কিস্তি, যা চাঁদপুর-১ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা ও রাজনৈতিক গতিশীলতার উপর আলোকপাত করছে।
চাঁদপুর-১ আসন, যা কচুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত, ইতিমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর মতো এবারও দলীয় মনোনয়ন কে পাবেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। তবে, বেশ কয়েকটি দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা কচুয়ার গ্রাম-গঞ্জে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে গেছেন।
চাঁদপুর-১ আসন ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং গত বছর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে বিএনপির আ ন ম এহসানুল হক মিলন এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে তিনি আওয়ামী লীগের মুহিউদ্দিন খান আলমগীরকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন। তবে, ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির বর্জনের সুযোগে আলমগীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকারের পতন এবং ২০২৫ সালের ১০ মে আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞার পর ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯২৯ ভোটারের এই আসন এখন নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি।
বিএনপি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে এই আসন থেকে নির্বাচিত মিলন ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জোট সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আমলে পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ তাঁকে স্থানীয় ভোটারদের পাশাপাশি দেশব্যাপী জনপ্রিয় করে তুলেছিল। এছাড়া, হিলসা মাছ সংরক্ষণে তাঁর “জাটকা নিধন প্রতিরোধ আন্দোলন” জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। বর্তমানে তিনি কচুয়ার গ্রাম-গঞ্জে দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোটারদের সাথে সাক্ষাৎ করছেন এবং স্থানীয় বিএনপি ইউনিটের সাথে সভার মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করছেন। তাঁর ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার জন্য আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়ে জোরালো বক্তব্য ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বিএনপির অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মোশাররফ হোসেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাজমুন নাহার বেবী, কচুয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আ হ ম মনিরুজ্জামান দেওয়ান মানিক, ঢাকা মহানগর উত্তর বনানী থানা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইমান হোসেন নূর এবং অস্ট্রেলিয়া শাখা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মো. হাবিবুর রহমান। এই নেতারা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং কচুয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে ছোট জনসভার আয়োজন করছেন।
জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মুহাদ্দিস আবু নছর আশরাফী এখনও পুরোপুরি সক্রিয় প্রচারণা শুরু করেননি। ২০১৩ সালে নিষেধাজ্ঞার পর ২০২৫ সালের জুনে জামায়াত রাজনৈতিক স্বীকৃতি ফিরে পেলেও, বিএনপির সাথে তাদের জোট ভেঙে যাওয়ায় তারা এবার স্বাধীনভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আশরাফী, কচুয়ার ধর্মপ্রাণ ভোটারদের আকর্ষণে ইসলামী শাসন ও সামাজিক ন্যায়ের উপর জোর দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এই আসনে ড. আরিফ হোসেনকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। তরুণ ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয় এই দলটি ২০২৪ সালের আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে কাজে লাগিয়ে কচুয়ায় প্রচারণা চালাচ্ছে।
অন্যান্য দলের মধ্যে গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-গণমাধ্যম বিষয়ক সম্পাদক এনায়েত হোসেন (হাসিব), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি মুফতি আনিসুর রহমান কাসেমী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রবিউল ইসলাম রুবেল চাঁদপুর-১ আসনে প্রচারণায় নেমেছেন।
চাঁদপুর-১ আসনের রাজনৈতিক গতিশীলতা বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোর উপর নির্ভর করছে। জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক সলিমউল্লাহর নেতৃত্বে দলটি আওয়ামী লীগ বিরোধী জনমতকে কাজে লাগাতে চাইছে। তবে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এনসিপি তরুণ ভোটারদের মধ্যে নতুন আশা জাগিয়েছে, কিন্তু তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রচারণায়ে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। জামায়াতের প্রচারণায় কিছুটা ধীরতা তাদের ধর্মীয় ভোটারদের ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং সংস্কার প্রক্রিয়া চাঁদপুর-১-এ নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৪০ শতাংশের নিচে ছিল, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর অবিশ্বাস প্রকাশ করে। মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টা নতুন ভোটার, বিশেষ করে তরুণদের, অংশগ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চাঁদপুর-১ আসন ২০২৬ সালের নির্বাচনে তীব্র প্রতিযোগিতার সাক্ষী হতে চলেছে, যেখানে বিএনপি, এনসিপি এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীরা ভোটারদের সমর্থন আদায়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।




