চাঁদপুর সকাল

ইতিহাসের পাতায় বাংলা নববর্ষ

প্রায় ২১ ঘন্টা আগে
ইতিহাসের পাতায় বাংলা নববর্ষ
ডি.এম ফয়সাল

পহেলা বৈশাখ সুপ্রাচীন বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। যা প্রতিটি বাঙালির কাছে এক অনন্য অনুভূতি এবং আবেগের শিহরণ। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে আর পুরাতন বছরকে বিদায়ের এই আয়োজন বাঙালি সংস্কৃতির পরিচায়ক ও ধারক।

ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি তোলার মৌসুমে এ নিয়ে ঝামেলা হতো। এতে অসময়ে কৃষকেরা খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য হতেন। খাজনা আদায় আরও সহজ করতে মুঘল সম্রাট আকবর প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন।

সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌরবর্ষ ও আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের পঞ্জিকা তৈরি করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ (মতান্তরে ১১ মার্চ) থেকে বাংলা সন গোনা শুরু হয়। তবে আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬ খ্রি.) থেকে এই সনের কার্যকারিতা ধরা হয়। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলাবর্ষ নামে পরিচিত হয়।

সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পরদিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিকেরা নিজ নিজ অঞ্চলের মানুষকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতে শুরু করেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যার রূপ পরিবর্তিত হয়ে এখন এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বইকে বোঝানো হতো। আসলে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সব স্থানেই পুরোনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানিরা তাঁদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকেন। এই প্রথাটি এখনো বেশ প্রচলিত।

১৯১৭ সালে প্রথম আধুনিক নববর্ষ উদ্যাপনের খবর পাওয়া যায়। ১৯৩৮ সালেও ছিল একই আয়োজন। ১৯৬৭ সাল থেকে বাংলার এ অংশ ঘটা করে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। ঢাকা শহরে পয়লা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। সংগঠনটি গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান জানায়। পয়লা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। এরপর ১৯৮৮ সালের ১৯ জুন থেকে বাংলা একাডেমীর সুপারিশ করা পঞ্জিকা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়।

পহেলা বৈশাখের রীতিনীতি, উৎসব আবহমান বাংলার এক অনন্য সংযোজন। শহর থেকে গ্রামে, দেশ থেকে বিদেশে সব বাঙালিই মেতে উঠে আনন্দ উল্লাসে। তরুণদের গায়ে লাল-সাদা পাঞ্জাবী থাকে, তরুণীরা শাড়ি পরে। খোঁপায় থাকে ফুল, হাতভর্তি কাচের চুড়ি। বাচ্চারা রঙিন জামা পরে মেলায় যাওয়ার বায়না ধরে। বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নে থাকে দই-মিষ্টি, বিন্নি ধানের খৈ, মোয়া, সন্দেশ, ভাত, তরকারি, ডাল, পান্তাভাত। থাকে হরেক রকম ভর্তা, ইলিশ মাছ ভাজি, ঠান্ডা পানীয় ইত্যাদি । পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিস্তৃতি ব্যাপক। আসুন এখন জেনে নিই দেশীয় কিছু সংস্কৃতি সম্পর্কে যা নববর্ষে পালিত হয়।

পহেলা বৈশাখে বৈশাখী মেলা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিবছর গ্রাম থেকে শহরে প্রতিটি অঞ্চলেই বৈশাখী মেলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে লালদীঘির ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় জব্বারের বলিখেলা। আর বর্ষবরণের এ মেলা প্রবাসীদের জন্য হয় মিলনমেলা। দীর্ঘ ব্যস্ততার অবসরে বৈশাখী মেলা প্রবাসী বাঙালিদের দেয় অফুরন্ত আনন্দ। জাপানে প্রতি বছরই অনেক ঘটা করে বিশাল পরিসরে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা। জাপান প্রবাসীদের এ মিলনমেলার রেশটা থাকে সারা বছর। এ ছাড়া নিউইয়র্ক, লন্ডন, কানাডাসহ বিশ্বের অন্যান্য বড় বড় শহরে বসে বৈশাখী মেলার আয়োজন।

বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কালের পরিক্রমায় যুগের পর যুগ এই উৎসব বাঙালির মনে প্রাণে আবেগের শিহরণ তৈরি করে আসছে।দেশীয় সংস্কৃতি হিসেবে পহেলা বৈশাখের সঠিক ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখা প্রতিটি সুনাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য।