চাঁদপুর সকাল

হাইমচরে ৫০ কোটি টাকার পানের ব্যবসা: সমৃদ্ধির পথে প্রতিবন্ধকতা

১০ মাস আগে
হাইমচরে ৫০ কোটি টাকার পানের ব্যবসা: সমৃদ্ধির পথে প্রতিবন্ধকতা

চাঁদপুর জেলার উপকূলীয় উপজেলা হাইমচরের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হলো পান চাষ। প্রতি বছর এখানে প্রায় ৫০ থেকে ৫২ কোটি টাকার পান বিক্রি হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত পান সরবরাহ করা হয় পার্শ্ববর্তী উপজেলা ও জেলার বাজারে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন রোগের কারণে কৃষকরা প্রায়ই ক্ষতির সম্মুখীন হন। কৃষকদের অভিযোগ, তারা এখনো কোনো সরকারি প্রণোদনা বা আর্থিক সহায়তা পাননি।


হাইমচর ভৌগোলিকভাবে মেঘনা নদীর দুই তীরে বিভক্ত। পূর্ব তীরের বাসিন্দারা মূলত কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, আর পশ্চিম তীরের চরাঞ্চলের মানুষ মাছ ধরা ও কৃষির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। এখানে দীর্ঘদিন ধরে মহানলী, চালতা কোঠা, নল ডোগা এবং সাচি জাতের পান চাষ হয়ে আসছে। অনেক পরিবার বংশপরম্পরায় এই চাষের সঙ্গে যুক্ত, এবং পান তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান ভিত্তি।


উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীত মৌসুম ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই পান সংগ্রহ ও বিক্রির কাজ চলে। আগে পানের প্রধান বাজার ছিল চাঁদপুর শহরের বাইরে, কিন্তু এখন হাইমচর উপজেলা সদরের কাছে বেশ কয়েকটি পানের আড়ত গড়ে উঠেছে। এখানে প্রতিদিন বড় পরিসরে পাইকারি কেনাবেচা হয়।


উত্তর আলগী ইউনিয়নের মহজমপুর গ্রামের কৃষক ফারুকুল ইসলাম গাজী দেড় একর জমিতে পান চাষ করেন। তাঁর বরজে প্রতিদিন তিন থেকে চারজন শ্রমিক কাজ করেন। তিনি জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই বড় ধরনের ক্ষতি হয়। ভালো বাজার মূল্য পেলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তবে তিনি এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পাননি।


একই গ্রামের আরেক কৃষক মোহাম্মদ হারুন বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষরা পান চাষ করতেন, এখন তিনি সেই বরজ পরিচালনা করছেন। পানে রোগ দেখা দিলে উৎপাদন কমে যায়, শিকড় পচে নষ্ট হয়, এবং নতুন করে শিকড় বসাতে হয়। প্রশিক্ষণের অভাবে তাঁদের পুরনো কৃষকদের কাছ থেকে দেখে দেখে কাজ শিখতে হয়।


পান ব্যবসায়ী মো. রাসেল দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পেশায় রয়েছেন। তিনি হাইমচরের বিভিন্ন বরজ থেকে পান কিনে স্থানীয় বাজারে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করেন। বাবুরহাট, মহামায়া, চান্দ্রা বাজারসহ আশপাশের বাজারে শতাধিক ব্যবসায়ী এই ব্যবসায় সক্রিয়।


ফরিদগঞ্জ উপজেলার কামতা গ্রামের পান ব্যবসায়ী চেরাগ আলী ৩০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও মঙ্গলবার বিভিন্ন হাটে পান বিক্রি করেন এবং হাইমচর থেকে গড়ে অর্ধলাখ টাকার পান কেনেন। এই ব্যবসাই তাঁর পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।


হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাকিল খন্দকার জানান, চলতি বছরে ২৩৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে, এবং ছোট-বড় মিলিয়ে ১,০৭২টি বরজ রয়েছে। প্রতি বছর ৫০ থেকে ৫২ কোটি টাকার পান বেচাকেনা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগবালাই দেখা দিলে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে পানচাষিদের জন্য এখনো কোনো সরাসরি সরকারি সহায়তা বা প্রণোদনা নেই।


হাইমচরের পান চাষ গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হলেও এই খাত এখনো সরকারি সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত। কৃষকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে।